ফয়সাল খানঃ  টাকার অভাবে খেতে পায় না এমন অনেক টোকাই ছিন্নমূল শিশুদের গল্প শুনে থাকি, কিন্তু টাকার জন্য গোসল না করে থাকার ঘটনা সচরাচর ঘটতে শুনা যায় না। সারাদিন পথে পথে ঘুরে বোতল কুড়িয়েও সন্ধায় একটু মাথা গুজার ঠাই হয় না অনেক টোকাইদের। ভাসমান অনেক টোকাইয়ের সাথে কথা বলে জানা যায়, বাবা মায়ের আদর ভালবাসা থেকে বঞ্ছিত হয়ে অভাবের তারনায় ঢাকায় আসে এসব শিশু-কিশোরেরা। এক সময় এরা সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ীদের শিকার এ পরিণত হয়। অনেক এনজিও ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বড় বড় কথা বললেও বাস্তবে সরকারী বা বেসরকারীভাবে এদের নেই কোন সঠিক তদারকি। যার ফলে শিশুরা অল্প বয়সেই জড়িয়ে পড়ছে মাদক ব্যবসায়, চুরি, ছিনতাই সহ নানা অপরাধে। পদে পদে অপমান আর লাঞ্ছিত হয়ে এক সময় এদের মধ্য থেকেই জন্ম হয় ভয়ংকর সন্ত্রাসীর।

একদিন কমলাপুর  ট্রেনের মধ্যে কথা হয় এমনি এক জন টোকাইয়ের সাথে, তার নাম সহাগ, বাড়ী নরসংদি। বাবা মায়ের অভাবের সংসার এ পরালেখা হয়নি তার। কবে স্কুলে গেছে তাও সঠিক মনে নেই ১১/১২ বছর বয়সী কিশোর সোহাগের। টঙ্গিতে এক ভাঙ্গারী ব্যবসায়ীর দোকানে রাতে থাকে সে আর সারা দিন পানির খালি বোতল কুড়িয়ে কমলাপুর থেকে সন্ধার ট্রেনে দোকানে যায় সে। দিন শেষে বোতল ছাড়া দোকানে গেলে না খেয়ে থাকতে হলেও মালিকের প্রহার থেকে রক্ষা পায় না।

এই মালিকের অধীনে তার মতো আরও ৬/৭ জন একসাথে থাকে আর একই কাজ করে। তাদের সবার জীবান ধারা এক না হলেও কাছাকাছি। ১কেজি বোতলের বিনিময়ে সে পায় ২০ টাকা। প্রতিদিন ২/৩ কেজির বেশী বোতল কুড়াতে পারেনা সে। এই ৪০-৬০ টাকা দিয়া দুপুর আর রাতের খাবার খেতে হয়। আবার এই টাকা থেকেই মাসে মার কাছে ৭/৮শ টাকা পাঠয় সোহাগ। সকালে কখনো দোকানের মালিকের দেয়া ডাল-ভাত আবার কখনও না খেয়ে দিনের কাজ শুরু করতে হয়। গরমের মধ্যেও ২/৩ দিন পর পর গোসল করে শুধু ১০ টাকা বাঁচানোর জন্য। গোসলের কোনো ব্যাবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়েই গোসলের জন্য  পাবলিক টয়লেট বা মসজিদ যেতে হয় তাদেরকে। ১০ টাকা না দিলে মসজিদেও গোসল করার জায়গা হয় না এদের।

রাত ১২ টার পর দকান বন্ধ হওয়ার আগে ঘুমানোর সুযোগও হয় না তাদের। বিনোদন বলতে শধু টিভিতে ভারতীয় বাংলা সিনেমাই দেখা হয় তার। ভারতীয় নায়িকা কোয়েল মল্লিকের ছবি ভালো লাগে তার। মানুষ এদেরকে কাজে নিতে চায় না আর নিলেও কেউ বিশ্বাস করে না। সবাই চোর আর ছিনতাইকারী মনে করে, তাই অন্য কোনো কাজে যাওয়ার ইচ্ছাও নেই ওদের। জীবনে কোন দিন ও কেউ এদেরকে তুমি বলে ডাকেনি।

কমলাপুর থেকে ট্রেনে বসে ৩ টোকাই (সহাগ, কাউছার সেলিম) আর সাথে অনেকক্ষণ কথা বলে ও মালিকের নাম ঠিকানা বলতে রাজি হয় নি কেওই। পরনে ময়লা কাপর খেয়ে না খেয়ে অনাদর অবহেলায় বড় হচ্ছে এমন শত শত সোহাগ সেলিম আর কাওছারেরা। শুধু মাত্র চোর আর ছিনতাইকারী বলে মধ্যযুগীয় কায়দায় প্রহার করে আর সমাধান করা যাবে না। সমাজ, রাষ্ট্র সহ সকেলের একটু সহানোভুতি- ভালবাসা পেলে এরাও বেড়ে উঠতে পারবে। পারবে সুন্দর একটি জীবনের স্বপ্ন দেখতে।

Share.

Comments are closed.