বিশেষ প্রতিনিধি: গাজীপুরের পাতারটেকের আলোচিত বাড়িটিতে চারটি ফ্ল্যাট  রয়েছে। যার একটি জঙ্গিরা ভাড়া নিয়েছিল। আর বাকিগুলোতে পরিবার থাকে। তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই বাড়িতে জঙ্গি থাকত এটা তারা বুঝতে পারেননি কেউই।

গাজীপুরের পাতারটেকের জঙ্গি আস্তানা

গাজীপুরের পাতারটেকের জঙ্গি আস্তানা

বাড়িটির নিচতলার ভাড়াটিয়া আসমা বেগম।  কেমন দেখেছেন জঙ্গীদের জানতে চাইলে গাজীপুর টাইমসকে তিনি বলেন, ঘটনার দিন সকালে সাদা পোশাকে সাত-আটজন লোক এসে বাড়ির উপরে উঠছিলেন। ওই সময় তাদের পরিচয় জিজ্ঞেস করলে তারা উপরে তাদের লোক আছে বলে চলে যান।

এর কিছুক্ষণ পর ওই ব্যক্তিরা নেমে এসে সবাইকে বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য বলেন। এরপরই শুরু হয় পুলিশের অভিযান। তখন আমরা জানতে পারি বাড়ির দোতলার নতুন ভাড়াটিয়ারা জঙ্গি।

তিনি বলেন, দুমাস আগে ভাড়াটিয়ারা ওই বাড়িতে ওঠে। তাদের দু-একজনকে মাঝেমধ্যে সন্ধ্যার দিকে বের হতে দেখা গেছে। রাতে ফেরার সময় ব্যাগের ভেতর শাকসবজি নিয়ে আসতে দেখেছেন।

দোতলা থেকে নিচতলায় একদিন ময়লা পানি পড়ার পর উপরে গিয়ে ওদের দরজায় কড়া নাড়েন আসমা। কিছু সময় পর একজন উঁকি দিয়ে দরজা নাড়ার কারণ জানতে চায়।

তবে বাসার ভেতরে আসমাকে প্রবেশ করতে দেয়নি। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে বাড়ির মালিক প্রফেসর ওসমান গনিকে বিচার দিয়েও কোনো লাভ হয়নি।

আসমা জানান, তিনি বুঝতেই পারেননি, তার বাসার ওপরেই এত দুর্ধর্ষ জঙ্গি থাকতো।

ও ই বাড়ির নিচতলার ফ্যাটের একটি কক্ষের অপর ভাড়াটে জাহিদুল ইসলাম বলেন, তিনি স্থানীয় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। বাড়িটির দ্বিতীয় তলার পূর্ব পাশের ফ্ল্যাটটি দুমাস আগে ওরা ভাড়া নেয়। তবে তাদের খুব কমই দেখা যেত।

তারা বাসা থেকে বের হতো কম। শুক্কুর নামে ওই বাড়ির আরেক ভাড়াটিয়া বলেন, আমি পিকআপ ভ্যান চালাই। গত কদিন আগে দোতলার ফ্যাটের সামনে একজোড়া স্যান্ডেল দেখে বাড়িওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে, দোতলার পূর্ব পাশের ওই ফ্যাটটি ভাড়া হয়েছে কিনা? তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন, ভাড়া হয়েছে। তবে আমি ভাড়াটিয়াদের কখনও দেখিনি।

অপর ভাড়াটিয়া জুলেখা বেগম জানান, তিনি প্রায় ২০ দিন আগে ওই বাড়িতে ভাড়ায় উঠেছেন। জঙ্গিরা মাঝে মধ্যে বের হলেও কারও সঙ্গে কথা বলতো না।

অভিযানের ১২ ঘণ্টা পর বাড়ির নিচতলা থেকে সন্তানসহ এক মাকে উদ্ধার করে পুলিশ স্বজনদের কাছে নিরাপদে পৌঁছে দেয়। অভিযানের পুরোটা সময় ধরে’ তিন বছরের সন্তান নুরুন্নাহারকে নিয়ে আয়েশা বেগম নিচতলার ফ্ল্যাটের একটি কক্ষের এক কোনায় ছিলেন।

জানতে চাইলে গাজীপুর টাইমসকে আয়েশা বেগম বলেন, অভিযানের প্রথমে তিনি তার মেয়েকে নিয়ে রুমের দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়েছিলেন। পুলিশের ডাকাডাকি করেছে কিনা শুনতে পাননি। তিনি জানান, তিনি গ্রামের বাড়িতে থাকেন। তার স্বামী সোবহান শেখ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।

নিচ তলার পূর্বপাশের ফ্যাটের একটি রুম দুই হাজার টাকায় ভাড়া নিয়ে তার স্বামী থাকেন। তার খালাতো ভাইও স্বামীর সঙ্গে ওই রুমে থাকেন। কয়েকদিন আগে আয়েশা সেখানে বেড়াতে এসেছেন। আয়েশা বলেন, ঘটনার দিন হঠাৎ ১১টার দিকে গোলাগুলির শব্দে ঘুম ভাঙ্গে তার। সঙ্গে সঙ্গে বাসার বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু দরজা বাইরে লাগানো থাকায় বের হতে পারিনি।

পরে বিষয়টি ফোনে স্বামীকে জানান তিনি। তার কাছ থেকে শুনি যে, বাড়িতে পুলিশ জঙ্গিবিরোধী অভিযান চালাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, অভিযানের সময় থেমে থেমে প্রচ- শব্দ হচ্ছিল। তখন আমরা মা-মেয়ে কান্না করি আর দোয়া পড়তে থাকি।

তখন মনে হচ্ছিল, ভবনটি ভেঙ্গে মাথায় পড়বে। ভয়ে সারাদিন রুমের এক কোনায় গিয়ে বসেছিলাম। আমি এমন ভয় আর কখনো পাইনি। তিনি বলেন, যতদিন বাড়িটিতে থেকেছি, কখনও বুঝতে পারিনি যে, এখানে এত জঙ্গি আছে।

গাজীপুর টাইমস/১০/১০/১৬/০০৭

Share.

Comments are closed.