মাযহার: কিছু কথা বলতেই অশ্রুসজল হয়ে যায় রাব্বির চোখ। অনেক কথা বলার পরে সে জানায়, যখন দেখি ষ্টেশনে আমাদের মত ছোট ছেলেমেয়েদের তার বাবা-মা খাইয়ে দিচ্ছে, খেতে চাচ্ছে না তবু জোড় করে খাওয়াচ্ছে তখন আমার খারাপ লাগে। তাছড়া বাবা-মায়ের হাত ধরে হাঁটতাম দেখলেও খারাপ লাগে।

জয়দেবপুর রেল লাইনে টোকাইদের জীবনের গল্প

জয়দেবপুর রেল লাইনে টোকাইদের জীবনের গল্প

কিছুদিন আগে কথা বলেছিলাম জয়দেবপুর রেল স্টেশনে থাকা ফজলে রাব্বির সাথে। বয়স দশ কি এগার হবে। বাবা-মার ছাড়াছাড়ির পর দাদীর সাথেই থাকে সে। বাবা-মা দুজনেই আবার বিয়ে করে ঢাকায় বসবাস করছে।গরু-ছাগল রাখায় রাব্বির কাজ। একাজে একটু অবহেলা হলেই নির্মম নির্যাতনের স্বীকার হতে হয় রাব্বিকে।

রাব্বিসহ বেশ কিছু টোকাইয়ের সাথে কথা বলে জানা যায় তাদের জীবনের লক্ষ্য। কেউ চা দোকানি হবে। কেউ হকার, কেউ ভাংগারী দোকানদার। তবে অনিক পুলিশ হবে। তার ইচ্ছা যে ভাংগারী মামারা তাদের গাম দেয় তাদের বিচার করবে। রাব্বি একটা চায়ের দোকান দিতে পারলেঈ খুশি।

একদিন মাঠে গরু চড়াতে যায় সে। বন্ধুদের সাথে খেলাতে খলতে সন্ধ্যা নেমে আসে। গরু খোঁজে পায়নি বলে দাদীর ভয়ে ওই দিনই যশোর থেকে ট্রেনে চড়ে জয়দেবপুরে আসে রাব্বি। আশপাশে হাজারো মানুষের ভেতরে কেউ নেই তার পরিচিত। তবে তার বয়সী কিছু ছেলেদের লক্ষ্য করেছে সবসময় ষ্টেশনে ঘুরাফেরা করতে। কেউ ভিক্ষা করে,কেউ বোতল সংগ্রহ করে। ওরা দেখতে খুব নোংড়া। তাই প্রথমে না মিশলেও এক পর্যায়ে ওদের সাথেই বেশ সখ্যতা গড়ে উঠে তার।

ইব্রাহিম, সিয়াম, শিমুল ও অনিকট ওদের পেছনের গল্প গুলো ভিন্ন হলেও এখানে সবাই এক। ষ্টেশনই তাদের থাকা, খাওয়া ও খেলার জায়গা। সারাদিন এক সাথে। অনেক সময় আলাদা আলাদা ভাবে বোতল সংগ্রহ করে,কেউ কেউ ভিক্ষা করে, কেউ খালি বোতলে পানি ভরে বিক্রি করে যে টাকা পায় তা দিয়েই সারাদিন চলে।

ইব্রাহিম জানায়, সারাদিনে তার ৩০/৪০ টাকা আয় দিয়ে, সকালে দশ টাকার কলা রুটি, দুপুরে বিশ টাকার ভাত ও রাতে দশ টাকার কিছু কিনে খায় সে। যেদিন টাকা কম আয় হয় সেদিন রাতে না খেয়েই ঘুমায় তার মতো অনেকেই।

কর্মব্যস্ততা পর সবাই নিজ নিজ বাসায় শান্তিতে ঘুমাতে যায়। তখন এই ছোট ছোট রাব্বিদের ঘুম ভেঙে যায় ট্রেনের হর্ণ শুনে বা ভাসমান ছিচকে মাস্তানরা এসে উঠিয়ে দেয়। এখানেই শেষ নয়। সাথে টাকা আছে কিনা খোঁজা খোঁজি করে লুটে নেয় শেষ সম্বল টুক। অনেক সময় পুলিশ এসে সমস্যার সৃষ্টি করে বলে জানায় একাধিক টোকাই।

একাধিক টোকাইয়ের সাথে কথা বলে জানা যায়, রাতে কোনো কারণে ঘুমাতে না পারলে আবার অপেক্ষা করতে হয় আর একটা রাতের। রাতের ঘুমহীন চোখ গুলো দেখে অনেকে মনে করে পথশিশুরা সব সময় নেশাগ্রস্থ থাকে। একেবারে করেনা তাও অস্বীকার করেনি তারা। তবে এজন্য ভাংগারী মালিকদের দায়ী করে তারা। তাদের দাবী কাগজ বা বোতল বিক্রি করতে গেলে কিছু টাকার বিনিময়ে গাম(নেশা জাতীয়)দিয়ে দেয় তাদের হাতে। না নিলে মারধর করে।

গোসলের জায়গা না থাকায় সপ্তাহে দু-একবার গোসল করা হয় পাশের নোংড়া পুকুরে। আবার ঐ ভেজা কাপর পরার কারণে অনেকের গায়ে চর্মরোগ বাসা বেঁধেছে।

শিমুলের বাড়িতে ছোট বোন আছে। সে বোনকে ঈদের সময় পুতুল,গাড়ি,বেলুন কিনে দিত। মাঝে মাঝে মারধরও করতো। কিন্তু এখন তার জন্য খুব খারাপ লাগে।। মাঝে মাঝে তার কান্না পায়। যখন সে কথাগুলো বলছিল তার নিষ্পাপ চোখ থেকে তেল চিটচিটে গাল অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। সাথের কয়েকজন চুপি চুপি চোখ মুছার চেষ্টা করছে।

চলে আসার সময় দেখা গেল পাশেই এক পথশিশু খুব মনোযোগ সহকারে অনেক গুলো বোতল নিংড়ায়ে ফোটায় ফোটায় জুস এক বোতলে সংগ্রহ করছে। হয়তো এক ডুকল পরিমাণ হলে খাবে পরম তৃপ্তি সহকারে।

অনেক সরকারী,বেসরকারী উদ্যোগে এসব পথ শিশুদের লালন পালনের কথা বললেও বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে পৌছে না সভ্যতার আলো বাতাস।

জিটি/২৬/০৯/১৬/০০৭

Share.

Comments are closed.