মোখলেসুর রহমান জাহিদ: ঘড়ির কাটায় সময় তখন সকাল ৭:৩০ মিনিট। গাজিপুর টু ঢাকা মাহাসড়কের টঙ্গি স্টেশন রোড এলাকার ফুট ওভার ব্রিজ এর পাশে বাস থেকে নামলাম। ওভার ব্রিজ থেকে নামেই দেখি ব্রিজের নিচে খালি জায়গাটাতে মাটির তৈরী কয়েকটি চুলায় পিঠা তৈরী করে বিক্রি করছেন বয়স্ক একজন মহিলা।

স্বামীর কথা ভেবে আম্বিয়ার নির্বাক চাহনি

স্বামীর কথা ভেবে আম্বিয়ার নির্বাক চাহনি

ভাবলাম নাস্তা যখন করা হয়নি এই শীতের সকালে চিতই পিঠার সাথে বিভিন্ন ভর্তার সংমিশ্রণ এ নাস্তাটা হলে খুব একটা খারাপ হয় না। কিন্তুু পিঠা খাওয়ার পর দাম পরিশোধ করতে গিয়ে চুখ তো কপালে! একি এতো বড় চিতই পিঠা আজকের দ্রব্যমূল্যর বাজারেও ৫ টাকায় পাওয়া যায়? মনে কৌতুহল হলো এই পিঠা বিক্রেতার পরিচয় জানার জন্য। সকালে প্রায়ই বিভিন্ন জায়গায় এমন পিঠা দিয়ে হালকা নাস্তা সুবাদে বিভিন্ন পিঠা দোকানিদের সাথে পরিচয় হয় কিন্তুু এই পিঠাওয়ালি মহিলাক কেন জানি বাজারের অন্য দোকনিদের থেকে আলাদা মনে হলো।

কিভাবে তিনি দ্রব্যে মূল্যের এই চড়া বাজারেও এতো বড় পিঠা, সাথে আরো কয়েক রকম ভর্তা, ৫ টাকায় খাওয়ান? কি ওনার পরিচয়? কি ভাবে চলে এই বয়স্ক মহিলার পিঠা বিক্রির জীবন? এসব প্রশ্ন নিয়ে হাজির হই তার সামনে।

কথো বলার শুরুতেই তিনি জানান, ৪০ বছর ধরে পিঠা তৈরী করে বিক্রি করেন। তার নাম আম্বিয়া বেগম। গাজীপুর টাইমসের পাঠকদের জন্য এই কর্মঠ ও সংগ্রামী মহিলার সাথে আমাদের প্রতিনিধির কথোপকথন তুলে ধরা হল।

পিঠা বানাতে ব্যাস্ত আম্বিয়া

পিঠা বানাতে ব্যাস্ত আম্বিয়া

গ্রামের বাড়ি কোথায় জিজ্ঞাস করতেই পান খেয়ে লাল করা মুখে এক পশলা হাসি দিয়ে বললেন, গাজীপুর কাপাসিয়া। অল্প বয়সেই বিয়ে হয় এক অভাবের সংসারে। গ্রামে স্বামী কোন কাজ না পাওয়ায় দুজনে একসাথে চলে আসি শহরে। এখান পাশেই একটি টিনসিট বাসা নিয়ে থাকি। ছোট কাল থেকেই কখনো মানুষের দারস্থ হতে শিখিনি। আজ প্রায় ৪০ বছর এর বেশি সময় ধরে চলে আমার এই পিঠা তৈরীর জীবন।

মনে মনে ভাবতে লাগলাম, না জানি কতো রোদ, বৃষ্টি, ঝড় মিশে আছে এই ৪০ বৎসরের জীবনে। গল্প আরো বিস্তারিত জানার কৌতুহল আমার বেড়েই গেল। ধীরে ধীরে মনের কোনে প্রশ্নের সংখ্যা ক্রমশ বাড়তেই থাকে।

শুরুতেই প্রশ্ন করলাম আমার মনে বার- বার তাড়না দেওয়া সেই প্রথম প্রশ্নটি দিয়ে। কিভাবে এতো বড় পিঠা ৫ টাকায় বিক্রি করেন? আপনার কি পুসায় এত কম টাকায় বিক্রি করে?

আম্বিয়া : বহু দিন ধরে এই পিঠা বেচে সংসার চালাই, সেই অবুঝ থেকে শুরু করে পুরো যৌবন কাটিয়ে দিয়েছি
এই পিঠা তৈরি করে। এখন মানুষের প্রতি এক প্রকার মায়া জন্মে গছে। তাই এই এক সকাল বেলা ১০ কেজি চালের পিঠা বিক্রি করে মাত্র ১০০/ ১২৫ টাকা লাভ হয়। কিন্তুু মানুষ আমার তৈরী পিঠা খেয়ে কোন ভাবে ঠকবে আমি তা মানতে পারি না। আমি আম্বিয়া ঠকলেও আমি মানুষ ঠকাতে জানিনা।

আম্বিয়া বেগমের চিতই পিঠা

আম্বিয়া বেগমের চিতই পিঠা

এতক্ষন খুব হাসি মুখে কাথা বলা আম্বিয়াকে স্বামীর কথা জিজ্ঞেস করতেই চোখের দৃষ্টি পিঠা তৈরীর তাওয়া থেকে অনেক দূরে চলে গেছে। মুহূর্তেই যেন লাল ঠোটের হাসি মুখটা নিরব হয়ে গেছে। বুকে যেন শত বছরের ঝর্নার জল একসাথে হাঠাৎ বারাফ জমাট হয়ে গেল।
পরক্ষনেই নিজেকে একটু সামলে নিয়ে তিনি বলেন, একমাস আগেও আমরা দুজন একসাথে পিঠা বানাতাম, সে আমাকে বিভিন্ন কাজে সাহয্য করতো।
তখন কাম করতে খুব ভাল লাগতো।
কামের মাঝে একটু রেস্ট নিতে পারতাম। সেই আমাকে শিখিয়েছে জীবনে হরে না যাওয়ার গল্প। কিন্তুু এক মাস হলো তোমার খালু (আম্বিয়ার স্বামী) হার্টের রুগি তাই আর এক সাথে কামে নিয়ে আসি না। এখন সপ্তাহে প্রায় ১হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হয়।

গাজীপুর টাইমস: এখানে কোন ধরনের হয়রানির বা চাঁদাবাজির শিকার হতে হয়?
আম্বিয়া: এইডা তো ওভার ব্রিজ, এর নিচে তাই কারো কোন সমস্যা হয় না কিন্তুু প্রায় পুলিশ আইসা প্রায়ই সব ভাইঙ্গা দিয়া যায়। তাছারা অনেকে পিঠা খাইয়া টাকা না দিয়া চলে যায়।
আম্বিয়া বেগমের এক ছেলে। গার্মেন্টে কাজ করে। ছেলেটাকে খুব বেশি পড়ালেখা করাই তে পারেননি উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাহিরে কাজ কইরা ছেলেকে পড়াশুনা করানো খুব কঠিন। ছেলে খারাপ হইয়া যাইবো দেখে বিয়ের বয়স হওয়ার পরেই বিয়ে করাই দিছি। এখন বউডাও ছেলের সাথে কাজ করে।

গাজীপুর টাইমস : ছেলে পরিবার খরচ দেয়?
আম্বিয়া: খরচ কিছু দেয় কিন্তুু তাদের নিজেদের সংসার চালানোই কঠিন।

গাজীপুর টাইমস: আপনি তো বয়স্ক হয়ে গেছেন এখন কষ্ট হয় না এতো পিঠা বানাতে? এখন কি ভাল লাগে এমন কাজ করতে?
আম্বিয়া: কষ্ট তো হয়ই, হাতে আগের মতো ভার নিতে পারিনা এছারা এখন স্বামী অসুস্থ হওয়ায় আর কেউ বলে না এখন একটু রেস্ট নিয়ে আসো কিন্তুু ভাল লাগে বানাতে তাছারা এখন আর কি কইরা খাইতে পারমো।

এমন আরো কিছু কথা বলতে বলতে হাটাৎ আমি নিজেই যেন হারিয়ে গেছি
সেই ছেলে বেলার স্মৃতিতে, ঠিক যেন মায়ের হাতে তৈরী করা পিঠা খাচ্ছি,
“মা ছোট বেলায় বলতো আমি পিঠা বানাই তুই এখনে আমার সামনে বসে খা।” এদিকে আম্বিয়া বেগম অনেক কাছের মানুষের মতো সব কথার উত্তর দিচ্ছে আর পিঠা বানাচ্ছে, থেমে নেই আম্বিয়া বেগম এর পিঠা তৈরীর ব্যস্ততা। পাশ থেকে একের পর এক শুনছি ‘ খালা আমাকে দুইটা, আমকে তিনটা,চারটা, আমাকে পেকেটে দেন ইত্যাদি।

সকালে শত রিকশা চালক থেকে শুরু করে অনেক চাকরিজীবী মানুষের সারা দিনের কাজ শুরু হয় এই আম্বিয়া বেগম দক্ষ হাতের তৈরী পরিস্কার ও সুস্বাসু পিঠার আর ভর্তার সংমিশ্রণের নাস্তায়। আমাদের সমাজে এই আম্বিয়ার মতো এমন হাজারো আম্বিয়া নানা ভাবে দ্রতগতিতে চলমান আমাদের অর্থনীতির চাকার অদৃষ্ট চালিকা শক্তির এক- একটি ইউনিট হিসাবে কাজ করে। কিন্তুু আমরা নামধরী ভদ্র সমাজ কতটুকুইবা কৃতজ্ঞতা শিকার করি এই আম্বিয়াদের! কতটুকুইবা সহানুভূতির চুখে তাকাই এই আম্বিয়াদের প্রতি যারা তাদের জীবনে হাজারো সমস্যার থাকার পরেও বলে ‘আমি মানুষ ঠকাইতে জানিনা ‘বরং কৃতজ্ঞতার পরিবর্তে তারা পায় আমাদের নামধারী ভদ্রদের দ্বারা হাজারো অবহেলাপূর্ণ আচরণ ও লাঞ্চনা, নিচু মানুষ বলে হজারো কটুক্তিপূর্ণ কথা, শত হয়রানি শিকার।
আমাদের সমাজের এই মানুষগুলোকে কখনো টাকার বিনিময়ে খুশি করানো সম্ভব নয়। এইসব মানুষের সাথে দামা -দামী করা কিংবা বিল না দিয়ে চলে যাওয়া কখনো মানুষ নামে জীবের এমন কাজ ঠিক নয়। আপনি তাদের খুশি করতে চাইলে, খুব বেশি কিছু নয় শুধু আপনি বিদায় নেয়ার সময় নিচু সহানুভূতির সুরে অন্ত্যত এক বলুন বলুন : ‘ধন্যবাদ খালা, ভাল থাকনে, আসি’। হয়তো আপনার এই ছোট একটি কথায় তাদের মুখে দেখবেন এক পৃথিবী সমান আনন্দ।

গাজীপুর টাইমস ০৩/১২/১৬/০০৭

Share.

Comments are closed.