image

অধ্যাপক শামসুল হুদা লিটনঃ গণতন্ত্র বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় সরকার ব্যবস্থা। গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার মালিক হল জনগণ। বাঙ্গালি জাতি গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কায়েমের জন্য পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ তেইশ বছর লড়াই সংগ্রাম করেছে। শ্বৈরাচারী আইয়ুব খান সার্বজনীন ভোটাধিকারের পরিবর্তে সমগ্র পাকিস্তানে ৮০ হাজার মৌলিক গণতন্ত্রিদের হাতে ভোটাধিকারের ক্ষমতা দিয়েছিলেন। এ ৮০ হাজার মৌলিক গণতন্ত্রিরা রাষ্ট্রপতি থেকে সংসদ সদস্যদেরকে নির্বাচিত করতেন। এদের হাতে ইউনিয়ন কাউন্সিল, পৌরসভা পরিচালনার ক্ষমতাও প্রদান করা হয়েছিল। অত্যাচারী ও শ্বৈরাচারী আইয়ুব খানের সৃষ্ট এসব মৌলিক গণতন্ত্রিদের দাপট ছিল অনেক। তারা সবসময় সরকারের প্রকাশ্য দালালী করতেন। কিন্তু তাদের জনবিরোধী কর্মকান্ড এদেশের জনগণ কখনো মেনে নেয়নি। বাঙ্গালি জাতি আইয়ুব শাহীর মৌলিক গণতন্ত্রের নামে জনগণের ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যূত্থানের মাধ্যমে আইয়ুব খানের অগণতান্ত্রিক শাসনের পতন ঘটে। গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে, জনগনের ভোটের অধিকার হরন করে ক্ষমতাশালী শাসক আইয়ুব খান ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হন।

বাঙালি জাতি গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কায়েম এবং ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠার শ্বপ্ন নিয়ে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল। অনেক রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত শ্বাধীনতার পিছনে প্রেরণা যুুগিয়েছিল গণতন্ত্র। পশ্চিমারা গণতন্ত্রকে ভয় পেলেও বাঙালিরা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার মধ্যে মুক্তির শ্বপ্ন দেখেছিল।

বাঙালির ম্যাগনাকাটা খ্যাত ৬ দফা কর্মসূচির প্রথম দফায় সংসদীয় সরকার প্রদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। প্রথম দফায় আরো বলা হয়েছে, সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সকল প্রাপ্ত বয়স্কদের ভোটে আইনসভা গঠিত হবে। জনগণের আশা-আকাক্সখা অনুযায়ী ১৯৭২ সালে প্রণীত বাংলাদেশের সংবিধানে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। কিন্তু শক্তিশালী বিরোধীদলের অভাব ও তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর কারণে নতুন প্রতিষ্ঠিত সংসদীয় গণতন্ত্র বেশিদিন টিকে থাকতে পারেনি। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে সংবিধানের ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা বাতিল করে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। দীর্ঘ নয় বছর এদেশের মানুষ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য এরশাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। এরশাদ জনগনের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। এরশাদ জনমতকে কখনও তোয়াক্কা করত না। কিন্তু জনগন এটা মেনে নেয়নি। শ্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক”-এ চেতনা নিয়ে নূর হোসেন সহ সাধারণ মানুষ এরশাদের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে পড়েছিল। ১৯৯০ সালে গণ আন্দোলনে এরশাদের পতন হলে নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। সকলের ঐক্যমতের ভিত্তিতে সংবিধানের দ্বাদশ সংসদনীর মাধ্যমে বাংলাদেশে দ্বিতীয়বারের মত সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়।

বাঙালি যুগ যুগ ধরে পরাধীনতার শিকলে আবদ্ধ ছিল বলেই নিজের দ্বারা পরিচালিত গণপ্রতিনিধিত্ব মূলক শাসনকে নিজেদের জন্য বেছে নিয়েছে। মানুষের মনের অভিব্যক্তি ছিল, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত হবে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, বাক শ্বাধীনতায় কখনো হস্তক্ষেপ করা হবে না। জনগণের মতামতের ভিত্তিতেই সরকার গঠিত হবে। কিন্তু এদেশের মানুষ যে শ্বপ্ন নিয়ে বার বার গণতন্ত্রের জন্য, ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই-সংগ্রাম করেছে, নিজেদের মূল্যবান জীবনকে বিলিয়ে দিয়েছে সে শ্বপ্ন কি আদৌ পূরণ হয়েছে? জনগণ কি কখনো গণতন্ত্রের সফলতা ও সুফল প্রত্যক্ষ করেছে? শাসকগোষ্ঠী কি কখনো জনগণকে গণতান্ত্রিক শাসন উপহার দিতে সক্ষম হয়েছে? এভাবে অনেক প্রশ্নের উত্তর কিন্তু না-ই আসবে। গণতন্ত্র সম্পর্কে প্রয়াত মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন বলেছেন, “গণতন্ত্র হচ্ছে জনগণের কল্যাণের জন্য, জনগণের দ্বারা পরিচালিত, জনপ্রতিনিধিত্ব মূলক শ্বসন ব্যবস্থা”।

গণতন্ত্র সম্পর্কে প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সি.এফ.স্ট্রং বলেছেন, “জনগণের সক্রিয় সম্পত্তির উপর যে সরকার প্রতিষ্ঠিত, তাকেই গণতন্ত্র বলে”। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় দলমত, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের যোগ্যতানুযায়ী রাষ্ট্রীয় কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে। সরকার গঠন ও পরিচালনা করবে দেশের জনগন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের বাংলাদেশে গণতন্ত্রের নামে এসব কি হচ্ছে?

আমাদের দেশে সরকারের উপর জনগণের কতটুকু সম্মতি বা সমর্থন আছে এবং সরকার কতটুকু জনপ্রতিনীধিত্ব মূলক ও জনগণের দ্বারা পরিচালিত? দেশের সকল নাগরিক রাষ্ট্রীয় কাজে অংশগ্রহণের সমান সুযোগ পাচ্ছেন কী ? কিংবা সরকার গঠন ও পরিচালনায় সকল মানুষের অংশগ্রহণ আছে কী? এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে অনেক সময় ও ধৈয্যের প্রয়োজন। আমাদের এত সময় ও ধৈয্য আছে বলে মনে হয় না।

গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন জনগণের সম্মতি ও মতামত। কেননা, গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের সম্মতির উপর নির্ভরশীল। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ সরকার গঠন বা  পরিবর্তন করার সুযোগ পায়। গণতন্ত্রের মূলভিত্তি হলো নির্বাচন। জনগণ নির্বাচনের মাধ্যমেই তাদের সম্মতি বা রায় প্রকাশ করে থাকে। নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্র সম্ভব নয়। ব্যক্তি শ্বাধীনতা, অধিকার রক্ষা এবং গণতন্ত্রের সফলতার পূর্ব শর্ত হচ্ছে সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও সময় উপযোগী নির্বাচন। রাজনৈতিক দল হচ্ছে প্রতিনিধিত্ব মূলক গণতন্ত্রের অন্যতম মূল ভিত্তি। রাজনৈতিক দল জনমত গঠন সরকার গঠন, প্রতিনিধির নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। রাজনৈতিক দল জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভুমিকা রাখে। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করে থাকে এটা জনগণের সাংবিধানিক অধিকার। জনগণের সম্মতি, বহুদলীয় ব্যবস্থা, শ্বাধীন বিচারবিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা, নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা, আইনের শাসন, সংবাদপত্রের শ্বাধীনতা, প্রাপ্ত বয়স্কদের ভোটাধিকার, দায়িত্বশীল সরকার, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য। দেশের গণতন্ত্রের এ বৈশিষ্ট্য গুলি উপস্থিত না থাকলে মনে করতে হবে, দেশে গণতন্ত্র নেই, গণতন্ত্র মৃত। চাঁপাবাজী বা রেটরিক্স করে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। গণতন্ত্র অনুশীলন ও বাস্তবায়নের বিষয়। যেখানে জনগণের সম্মতি নেই, সেখানে গণতন্ত্র নেই। গণতন্ত্র মানেই জনগণ। জনগণ ছাড়া গণতন্ত্র মৃত, অর্থহীন। গণতন্ত্রের মূল শক্তিই জনগণ। জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া গণতন্ত্র সফল হতে পারে না। সুষ্ঠু জনমতের ভিত্তিতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই কেবল পারেন দেশ শাসন করতে, সরকার  পরিচালনা করতে। সুষ্ঠু জনমতের প্রতিফলন ছাড়া শক্তিশালী সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। জনমতের অভাব হলে সরকারের ভীত কেঁপে উঠে এবং সরকারের নৈতিক পরাজয় ঘটে।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে সবচেয়ে কলংকের দিন ৫ জানুয়ারী। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত হয় বিরোধী দল বিহীন একতরফা ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনে সারাদেশে বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় রেকর্ড সংখ্যক প্রার্থী অনায়াসে নির্বাচিত হয়েছেন। ১৫৪ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশ বিশ্বরেকর্ড গড়ে। ৩০০ আসনের মধ্যে ঐদিন মাত্র ১৪৩টি আসনের বিপরীতে নামমাত্র নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এসব নির্বাচনে আবার প্রধান প্রতিদ্বন্ধিও ছিলেন সরকার সমর্থিত বঞ্চিত বিদ্রোহী প্রার্থীরা। ১৫৪ আসনে বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় নির্বাচিত ক্ষমতাশীনরা নিজেদের হাসির পাত্রে পরিনত করে। বাংলাদেশ তথা, বিশ্বের ইতিহাসে এত অধিক সংখ্যক প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় নির্বাচিত হওয়া নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক ঘটনা। এর আগে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ৪৯টি আসনের মধ্যে ৪৮ জন এবং ২০০৭ সালের বাতিল হওয়া ২২ জানুয়ারির নির্বাচনে ১৭ জন বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবারেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক প্রার্থী বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় নির্বাচিত হয়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি করে। ৫ জানুয়ারী নির্বাচন ছিল ভোটার বিহীন একতরফা নির্বাচন। ঐ নির্বাচনে অংশ নেয়নি নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ২৮টি রাজনৈতিক দল। ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের শ্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের দেয়া নির্বাচনকেও হার মানিয়েছে ৫ জানুয়ারী ভোটারবিহীন একতরফা নির্বাচন।

বাংলাদেশে তথা বিশ্বের ইতিহাসে এই ধরনের নির্বাচন প্রথম। ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৪ আসনে নির্বাচন না হওয়ায় এবার ৫২.২২ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত হলো। এ নির্বাচনে জনগন তাদের মতামত প্রকাশের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। সারাদেশে ভোটারবিহীন নির্বাচনে ব্যাপক সহিংসতা ঘটে। এতে ২৬জন নিহত হন, আহত হন সহশ্রাধিক। কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি ছিল একেবারেই কম। প্রায় অর্ধশত ভোট কেন্দ্রে কোন ভোটই পরেনি। এর পরেও প্রহসনের এ নির্বাচনে ভোট ডাকাতি ও কাটচুপি হয়। ভোটারবিহীন প্রহসনমূলক গণতন্ত্র নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে ক্ষমতাশীলরা। ভোটারবিহীন নির্বাচন বাংলাদেশের মর্যাদাকে হাস্যকর অবস্থানে নিয়ে যায়। এ নির্বাচনে জনমতের প্রতিফলন ঘটেনি বলে জনগণের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভেরও সৃষ্টি হয়। ৫ জানুয়ারীর ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১৯ ফেব্রুয়ারী থেকে শুরু হয় ৬টি ধাপে ৪৮৭ টি উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচন কিছুটা শান্তিপূর্ণ হলেও তৃতীয় ধাপ থেকে শুরু হয় ভোট কেন্দ্র দখলের মহোৎসব। উপজেলা নির্বাচনে সহিংসতায় নিহত হয়েছে অর্ধশত মানুষ। জাতীয় নির্বাচনের উপজেলা নির্বাচনে ভোট দিতে না পারে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে সাধারণ মানুষ। উপজেলা নির্বাচনেও জনমতের সঠিক প্রতিফলন ঘটেনি। এভাবে বাংলাদেশে অনেক নির্বাচনে জনগণ তাদের সঠিক মতামত ও সম্মতির প্রকাশ করতে পারেননি। যে নির্বাচনে জনমতের প্রতিফলন ঘটে না, সে নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন বলা যাবে না। যে প্রতিনিধি জনগণের সম্মতির মাধ্যমে নির্বাচিত হয়নি তাকে জনপ্রতিনিধি বলা নিয়ে প্রশ্ন উঠাই শ্বাভাবিক। নাগরিকের অংশগ্রহণ ছাড়া কোন নির্বাচন হলে সে নির্বাচনে গণতন্ত্রের সঠিক প্রতিফলন ঘটবে না।

স্যার জন সীলি বলেছেন, “গণতন্ত্র হচ্ছে এমন এক ধরনের সরকার যেখানে সকলেরই অংশগ্রহণের সুযোগ আছে।”

গণতন্ত্রের শ্বার্থে সকল রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিকে সরকার পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। জনগণই ভোটের মাধ্যমে বাছাই করবে তাদের প্রতিনিধিদের। জনগণের মতামতের এ অধিকার যারা কেড়ে নিবে তারা শ্বৈরাচারী, ফ্যাসিবাদী ও গণতন্দ্র বিরোধী। গণতান্ত্রিক শাসন জনমতের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। সুষ্ঠু জনমত গণতন্ত্রের শ্বরূপ বজায় রাখে। এরজন্য জনমত গঠনের মাধ্যম গুলোকে মুক্ত শ্বাধীন রাখতে হবে। রেডিও, টেলিভিশনের শ্বায়ত্বশাসন দিতে হবে। সংবাদপত্রের শ্বধীনতা দিতে হবে। যেদেশে কথায় কথায় সংবাদপত্রের শ্বাধীনতা ক্ষুন্ন হয়, সরকারের সমালোচনা করলে পত্রিকা, টেলিভিশন বন্ধ হয়ে যায় সেদেশে গণতান্ত্রিক শাসন কতটুকু বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে?

গণতন্ত্রের ার্থে বিশেষ করে সংসদীয় গণতন্ত্রের শ্বার্থে আমাদের দেশে শক্তিশালী ও সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল থাকতে হবে। গণতন্ত্রে সুসংগঠিত দলের বিকল্প নেই। রাজনৈতিক দল ছাড়া সুষ্ঠু জনমতও গঠিত হতে পারে না। জনগণ রাজনৈতিক দলের মাধ্যমেই সংগঠিত হয়। গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দল জনমত গঠন করে ক্ষমতায় যায়। আধুনিক গণতন্ত্র হলো প্রতিনিধিত্ব মূলক গণতন্ত্র। প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের প্রাণ হলো জনমত। সুষ্ঠু ও সচেতন জনমতের উপর প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের সাফল্য নির্ভরশীল। রাজনৈতিক দল সংবাদপত্র, সভা সমিতি, রেডিও, টেলিভিশন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আইন-সভা, পরিবার, ধর্মীয় সংঘ, পেশাভিত্তিক সংঘ, জনমত গঠন ও প্রকাশে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসাবে ভুমিকা রাখে। গণতন্ত্রের শ্বার্থে জনমতের এসব গুরুত্বপূর্ন মাধ্যমকে শক্তিশালী ও শ্বাধিন করতে হবে। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ জনমতের উপর নির্ভরশীল। গণতন্ত্র ও জনমত প্রায় সমার্থক শব্দ। জনগণের সম্মতির ভিত্তিকে গণতান্ত্রিক সরকারকে ক্ষমতায় আসতে হবে। অন্য কোন পন্থায় ক্ষমতায় আসলে তাকে গণতান্ত্রিক শাসন বা গণতান্ত্রিক সরকার বলা যাবে না। গণতন্ত্রে নির্বাচন ও সরকার গঠনের ক্ষেত্রে জনমত, জনগণের সম্মতি মুখ্য ভুমিকা পালন করে। ক্ষমতাশীন দল ও বিরোধী দল জনমতকে সবসময় ভয় পায় এবং ভয় করে চলে। এর সুফল ভোগ করে জনগণ। জনমত ফ্যাসিবাদী ও শ্বৈরাচারী একনায়তান্ত্রিক সরকারের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী। কেননা, জনমতের চাপে আইয়ুব এরশাদের মত শ্বৈরশাসকও ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি। জনমতের চাপে সরকার জনগণের ভোটের অধিকার ও ভাতের অধিকার ফিরে দিতে বাধ্য হয়। যে সরকারের পিছনে জনমত থাকে না সে সরকার বেশিদিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না। জনমতই সরকারকে শক্তি যোগায়। শ্বৈরচারী সরকার জনমতকে ভয় পায় বলে সবসময় নানা অজুহাতে কালাকানুন দিয়ে জনমতকে চাঁপিয়ে রাখতে কিংবা ভিন্ন দিকে ধাবিত করতে চেষ্টা করে।
জনমতের চাপে সরকার জবাবদিহীতা প্রতিষ্ঠা করতে এবং জনগণের দাবী মেনে নিতে সচেষ্ট হয়। জনমতের চাপে দেশের দূর্নীতি দূর হয়। সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। জনমতের চাপে সরকার বিরোধীদলের যৌক্তিক দাবী মানতে এবং আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য হয়। কেননা, আলাপ-আলোচনা ছাড়া কোন গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। গণতন্ত্রে একতরফা নির্বাচন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোন স্থান ও সুযোগ নেই। সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের মধ্যে গণতন্ত্রের শ্বার্থে সমঝোতা ও ঐক্যমত প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক বার্কার বলেন, “গণতন্ত্র হচ্ছে- আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পরিচালিত সরকার।”

এক ব্যক্তির শাসন, এক দলীয় শাসন, বিরোধী দলকে সহ্য না করার মানষিকতা, বলপ্রয়োগ, ক্ষমতার অতিমাত্রায় কেন্দ্রিয়করণ, প্রহসনমূলক নির্বাচন, ক্ষমতাহীন আইনসভা, সংবাদপত্র, রেডিও টেলিভিশনে সরকারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রন আরোপ কখনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে থাকতে পারে না। এগুলো গণতন্ত্রের চিরশত্রæ, একনায়তন্ত্রের বৈশিষ্ট্য। গণতন্ত্র হচ্ছে জনগণের শাসন। কিন্তু একনায়তন্ত্র হচ্ছে একদলের শাসন। গণতন্ত্রে ক্ষমতার উৎস জনগণ। একনায়তন্ত্রে ক্ষমতার উৎস এক ব্যক্তি বা একটি দলীয় চক্র। গণতন্ত্র ব্যক্তির ¯^াধীনতায় বিশ্বাসী। একনায়তন্ত্র ব্যক্তি শ্বাধীনতার বিরোধী। গণতন্ত্রে আইনসভা সার্বভৌম কিন্তু একানায়কতন্ত্রে আইনসভা একটি প্রহসন মূলক প্রতিষ্ঠানে পরিনত হয়। মত প্রকাশের শ্বাধীনতা, সভা সমাবেশের শ্বাধীনতা ও রাজনৈতিক সংগঠন করার শ্বাধীনতা থাকায় গণতন্ত্রে বহু রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়। কিন্তু একনায়কতন্ত্রে এসব রাজনৈতিক অধিকার না থাকায় শক্তিশালী বিরোধী দল গড়ে উঠতে দেয়া হয় না। গণতন্ত্রে বিরোধীদলকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হয়। একনায়কতন্ত্রে পেশী শক্তিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। বিরোধী দল ও তাদের মতামতকে একনায়কতান্ত্রিক সরকার কখনো বরদাস্ত করতে পারে না। একনায়কতন্ত্রে জনগণের মতামতের কোন স্থান নেই। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা জনগণের সম্মতির উপর প্রতিষ্ঠিত শাসন ব্যবস্থা। এখানে জনগণের মতামত আলাপ-আলোচনা ও যুক্তিতর্কের মাধ্যমে সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু একনায়কতন্ত্রে রাষ্ট্রীয় শক্তি ও কর্তৃত্বের বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রয়োগ করা হয়। এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক হার্নশ বলেছেন, “গণতন্ত্রে যুক্তির জোরকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়, কিন্তু একনায়কতন্ত্রে জোরের শক্তির যুক্তিই প্রাধান্য লাভ করে।”

গণতান্ত্রিক শাসনই বাংলাদেশের নাগরিকদের দীর্ঘ দিনের  শ্বপ্ন ও চাওয়া-পাওয়া। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুক্ত, ১৯৯০ সালের শ্বৈরাচারী বিরোধী আন্দোলন, ১৯৯৬ সালের তত্ত¡াবধায়ক সরকার আন্দোলন ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। এদেশে বার বার জনগন গণতন্ত্রের  জন্য আন্দোলন করে সফল হলেও তা বেশিদিন ধরে রাখতে পারেনি।  ক্ষমতাসীনরা সবসময় জনমতকে উপেক্ষা করে ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য নানা কৌশল অবলম্ভন করেছে। জনগণ সুষ্ঠু মতামত প্রকাশের যতবারই সুযোগ পেয়েছে, ততবারই জনমতের রায়ে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীরা পরাজিত হয়ে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। জনগণের অংশগ্রহণ ও সম্মতি ছাড়া কোন শাসন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষৎ সচেতন জনগণের উপর নির্ভরশীল। জনগণই গণতন্ত্রের পাহারাদার। গণতন্ত্রের অতন্ত্র প্রহরী যেদেশের নাগরিক সে দেশে একদিন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবেই। গণতন্ত্রের জয় হবে। সদাজাগ্রত সুষ্ঠু জনমতের মাধ্যমেই বাংলাদেশে একদিন গনতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা সুদৃঢ় হবে। তখন জনমতের ভয়ে শাসকগোষ্ঠী কখনো জনগণের ভোটের অধিকার, বিরোধী রাজনৈতিক দলের বাক শ্বাধীনতা কেড়ে নেয়ার সাহস পাবে না।

লেখকঃ
মোঃ শামসুল হুদা লিটন
কবি, সাংবাদিক ও কলামিষ্ট
অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, তারাগঞ্জ কলেজ
কাপাসিয়া, গাজীপুর

Share.

Leave A Reply